ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

গবেষণায় চমক: অর্ধেক ফিডে দ্বিগুণ তেলাপিয়া

গবেষণায় চমক: অর্ধেক ফিডে দ্বিগুণ তেলাপিয়া
ad728
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনের তিন বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক সময় ও পদ্ধতিতে এরেটর ব্যবহার করলে হেক্টরপ্রতি তেলাপিয়া উৎপাদন প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশে এতদিন হ্যাচারি ও কিছু চিংড়ি ঘের ছাড়া এরেটরের ব্যবহার সীমিত ছিল। সচেতনতার অভাব, বিদ্যুৎ ব্যয় এবং কোন ধরনের এরেটর কখন চালাতে হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় চাষিরা কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছিলেন না। এই প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক মামুন পুকুরের জলের গুণগত মান, অক্সিজেন সরবরাহ এবং উৎপাদনশীলতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালনা করেন।

গবেষণায় উঠে আসে—পুকুরের তলায় ডিফিউজার ডিস্কের বাবল এবং ওপরে প্যাডেল এরেটর একসঙ্গে ব্যবহার করলে পানির সব স্তরে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বজায় থাকে। মাত্র পাঁচ মাসের চক্রে হেক্টরপ্রতি ২০–২২ টন তেলাপিয়া উৎপাদন সম্ভব হয়, যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদন ৭–৮ টনের বেশি নয়।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, রাতে নির্দিষ্ট বিরতিতে এরেটর চালালেই পানি ৫ পিপিএম অক্সিজেন ধরে রাখে—ফলে বিদ্যুৎ খরচ কমে আসে। পাশাপাশি এরেটর ব্যবহারে পুকুরের তলায় অ্যামোনিয়া জমা কমে, নাইট্রিফিকেশন বেড়ে যায় এবং প্রাকৃতিক খাদ্য বাড়ে। ফলে ফিডের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগে যেখানে ১ কেজি তেলাপিয়া উৎপাদনে ১.৫–২ কেজি ফিড লাগত, নতুন পদ্ধতিতে মাত্র ৬০০–৭০০ গ্রাম ফিডেই সম্ভব হয়।

পাঁচ মাসের একটি উৎপাদন চক্রে বিদ্যুৎ খরচ যেখানে প্রায় ৭০ হাজার টাকা, সেখানে ফিড সাশ্রয় হয় দেড় লাখ টাকার মতো। অতিরিক্ত মাছ বিক্রিতে আয় বাড়ে কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা। ফলে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যয়েই পুরো পুকুরের এরেটর স্থাপন সম্ভব হয়।

এর পাশাপাশি অধ্যাপক মামুন বর্তমানে সোলার সিস্টেম ও এইচডিপিই পণ্ড লাইনার ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব নিবিড় মৎস্যচাষের সম্ভাবনাও যাচাই করছেন।

অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমরা দেখেছি এরেটর সংযোজনের মাধ্যমে মাছ উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে, আর ব্যয় কমেছে। চাষি পর্যায়ে এই প্রযুক্তি পৌঁছাতে পারলে উৎপাদন, আয় ও পুষ্টি নিরাপত্তা—সকল ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আনবে।”

বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সের প্রতিনিধি প্রফেসর ড. আবু তৈয়ব আবু আহমেদ মনে করেন, “প্রযুক্তিটি দ্রুত ছড়িয়ে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মডেল খামার স্থাপন জরুরি।”

নোবিপ্রবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, “চাষিদের কাছে গবেষণার ফল পৌঁছাতে পারলে জাতীয় মৎস্য উৎপাদনে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।”

“যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে নিবিড় মাছ উৎপাদনের একটি উন্নত মডেল প্রণয়ন” শীর্ষক এই প্রকল্পে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ছিলেন প্রফেসর ড. দেবাশীষ সাহা, প্রফেসর ড. মো. রাকেব উল ইসলাম এবং রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট মিঠুন রায়।

মুক্তিসরণি/এমএস