নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রধান ফটকে প্রবেশ করলেই যে স্থাপত্যটি সবার নজর কাড়ে, সেটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। এই অনন্য স্থাপত্য কেবল একটি নির্মাণকর্ম নয়; এটি একদিকে শিল্প–নান্দনিকতার প্রতীক, অপরদিকে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক।
বাংলাদেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে নিজস্ব শহিদ মিনার—যা সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও মুক্তির চেতনাকে প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি স্থাপনার নকশার মধ্যেই থাকে স্বতন্ত্র বার্তা, জাতি ও মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ববোধ।
নোবিপ্রবির কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার একইভাবে নির্মিত হয়েছে শহিদদের মহত্তম ত্যাগকে অমর করে রাখার লক্ষ্যেই। এটি শিক্ষাঙ্গনে মানবতা, জ্ঞানচর্চা ও দেশপ্রেমের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক প্রতীকী স্তম্ভ।
২০১৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি—মহান ভাষা শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে—এই মিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ভাষার মর্যাদা রক্ষার এদিনটি জাতীয় ও বিশ্বদরবারে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ায় উদ্বোধনের তারিখটিও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত অর্থবহ।
২৬ ফুট উচ্চতার এই মিনারটি দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্ম হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরকে আলোকিত করে রেখেছে। এর স্থাপত্যে রয়েছে সাতটি স্তর, যা ১৯৫২ থেকে ১৯৭১—এই দীর্ঘ সময়ের সাতটি ঐতিহাসিক অধ্যায়কে প্রতীকায়িত করে: ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচন, স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার বিজয়।
ফাউন্টেনপেন–আকৃতির এই মিনারের নকশা দেশের অন্যান্য শহিদ মিনার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কলম—জ্ঞান, যুক্তি, সত্য অনুসন্ধান ও আলোকিত চিন্তার প্রতীক—বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মূল পরিচয়কে ধারণ করে। তাই স্থাপত্যে ফাউন্টেনপেনের ব্যবহার একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে একটি স্পষ্ট প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি করেছে।
বিশ্ববিখ্যাত উক্তি—“The pen is mightier than the sword”—এর বাস্তব রূপ যেন এই মিনার। কালো রঙের মূল কলাম দৃঢ়তা, শক্তি ও মর্যাদার প্রতীক। আর এর শীর্ষে টকটকে লাল গোলক শহিদদের রক্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়—যাদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। লাল–কালোর এই মেলবন্ধন যেন এক নিঃশব্দ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
কলমের কালো দেহ প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধির শক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে—যা একজন শিক্ষার্থীর জীবনবোধের কেন্দ্রে থাকা উচিত। আর লাল বৃত্তটি স্মরণ করায় সেই উত্তপ্ত সময়ের কথা, যখন রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল মাতৃভাষার অধিকার, স্বাধীনতার স্বপ্ন।
দিনের আলোয় ফাউন্টেনপেন–মিনারটি শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে, আর রাতের আলোয় এটি দাঁড়িয়ে থাকে অন্ধকারে আলোর দিশারী হয়ে। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরসহ জাতীয় দিবসগুলোতে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
শিক্ষার্থীদের কাছে এই মিনার কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়—এটি এক চেতনার কেন্দ্র। এখানে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থী যেন নতুন প্রতিজ্ঞায় উদ্বুদ্ধ হয়: তারা জ্ঞানের আলোয় নিজেদের এবং সমাজকে আলোকিত করবে।
নোবিপ্রবির এই শহিদ মিনার মনে করিয়ে দেয়, কলম শুধু লেখার উপকরণ নয়; এটি মুক্তির হাতিয়ার, সত্য প্রতিষ্ঠার শক্তি। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া শহিদদের উত্তরসূরি হিসেবে নতুন প্রজন্মকে তাই সত্য, ন্যায় ও স্বাধীন চিন্তার পথে অটল থাকতে হবে। মিনারের সামনে দাঁড়ালে যে কেউ ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও শিক্ষার চিরন্তন শক্তিকে অনুভব করতে পারে—এই নির্মাণ সেই স্মরণশক্তির অনির্বাণ প্রদীপ।
মুক্তিসরণি/এমএস
মুক্তিসরণি/এমএস
সামিয়া হোসেন মুনিয়া, নোবিপ্রবি